বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একুশে জুলাই মানেই একুশ বছর ধরে একচেটিয়া অধিকার ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাই মাসের এই আবহ একেবারেই ভিন্ন। এবার একুশে জুলাই ঘিরে বঙ্গ রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব ও চমকপ্রদ সমীকরণ। একদিকে যখন রাজ্যের শাসকদলের অন্দরে কালীঘাট তৃণমূল বনাম ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের চরম দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে, ঠিক তখনই মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রদেশ কংগ্রেসের শহীদ মঞ্চ।
রাজনৈতিক মহলকে চমকে দিয়ে জানা গেছে, এবার শহীদ মিনারে কংগ্রেসের শহীদ দিবসের মঞ্চে স্থান পেতে চলেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি!
কিন্তু কেন? যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্ব প্রতিনিয়ত সুর চড়াচ্ছেন, তাঁর ছবি হঠাৎ কংগ্রেসের মঞ্চে কেন? এই প্রশ্ন ঘিরেই এখন জোর চর্চা আলিমুদ্দিন থেকে শুরু করে কালীঘাটের অন্দরে।
মঞ্চে মমতার ছবি: কী ব্যাখ্যা কংগ্রেসের?
গোটা বিষয়টিতে তৈরি হওয়া জল্পনা ধামাচাপা দিতে ময়দানে নেমেছেন খোদ কংগ্রেস নেতারাই। প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের তরফ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে এই ছবি বিতর্কের আসল রসায়ন:
বর্তমান নয়, ইতিহাসের মমতা: কংগ্রেস নেতারা জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান কোনো ছবি তাঁদের মঞ্চে থাকছে না। থাকবে ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাইয়ের আন্দোলনের সময়কালীন ছবি।ইতিহাসের অমোঘ সত্য: প্রদেশ নেতৃত্বের মতে, সেদিনের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ও কাণ্ডারী ছিলেন তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই লড়াইয়ের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা যাই থাক না কেন, ইতিহাসকে তো আর অস্বীকার করা যায় না!ত্রিমুখী একুশে জুলাই: ছবি বনাম নো-ছবি
চলতি বছরে কলকাতার বুকে একুশে জুলাই পালিত হতে চলেছে তিনটি ভিন্ন জায়গায়, যা বাংলার রাজনীতিতে নজিরবিহীন:
আয়োজক পক্ষসমাবেশের স্থানমঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি?কালীঘাট তৃণমূলবিড়লা তারামণ্ডলের সামনেহ্যাঁ (স্বাভাবিকভাবেই মূল আকর্ষণ)ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলগান্ধী মূর্তির পাদদেশেনা (স্পষ্টভাবে না করে দেওয়া হয়েছে)প্রদেশ কংগ্রেসশহীদ মিনার ময়দানহ্যাঁ (আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে)এখানেই তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত রসায়ন। যে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল নিজেদের মঞ্চে মমতার ছবি রাখতে নারাজ, সেখানে বিরোধী দল কংগ্রেস কিন্তু মমতার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে স্বীকার করে নিজেদের মঞ্চে তাঁর ছবি রাখছে।
একই সাথে নিশানা মণীশ গুপ্তকেও!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি মঞ্চে রেখে আবেগ ছুঁয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক চাল চালতেও ভুলছে না কংগ্রেস। একদিকে যেমন সেদিনের আন্দোলনের নেত্রীকে সম্মান জানানো হচ্ছে, ঠিক তেমনই কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে তৎকালীন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব মণীশ গুপ্তকে। যিনি পরবর্তীকালে বাম জমানা পার করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছিলেন। কংগ্রেসের প্রশ্ন, যাঁর নির্দেশে সেদিন গুলি চলেছিল, তিনি কীভাবে মমতার প্রিয়পাত্র হলেন?
প্রস্তুতি তুঙ্গে শহীদ মিনারে
রবিবার শহীদ মিনারের সমাবেশস্থল সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন প্রদেশ কংগ্রেসের রাজ্য পর্যবেক্ষক প্রকাশ জোশী, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, অমিতাভ চক্রবর্তী এবং আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় সহ অন্যান্য শীর্ষ নেতারা। জানা গেছে, এবার কংগ্রেসের মূল মঞ্চটি দুটি ভাগে তৈরি হচ্ছে। যার একটি অংশে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি সসম্মানে বসানো হবে শহীদ পরিবারগুলিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে: কংগ্রেসের এই 'মমতা-কার্ড' আসলে এক ঢিলে দুই পাখি মারার কৌশল। একদিকে ঋতব্রতপন্থীদের তুলনায় নিজেদের আন্দোলনের আসল উত্তরসূরি হিসেবে প্রমাণ করা, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতীত ও বর্তমানের বৈপরীত্যকে জনতার সামনে তুলে ধরা। এখন দেখার, ২১শে জুলাইয়ের এই নতুন রসায়ন আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে কী নতুন মোড় আনে!