news-details
কলকাতা

যদুবাবুর বাজারে ভক্তের ঢল ভক্তি ও উল্লাসে সম্পন্ন ইসকনের রথযাত্রা

ঐতিহ্যের পথ বেয়ে ভক্তির জোয়ার। বৃহস্পতিবার যদুবাবুর বাজারের রাস্তা দিয়ে যখন ইসকনের রথ অতিক্রম করল, তখন যেন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। কেবল ধর্মীয় আচারের মেলবন্ধন নয়, ইসকনের রথযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা। এদিন রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। মহাপ্রভুর রথের রশিতে টান দিতে ভিড় জমিয়েছিলেন অগণিত ভক্ত, আর তাঁদের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল যদুবাবুর বাজার চত্বর। রথের চাকা গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন শহরের ব্যস্ত রাস্তায় নেমে এল পরম প্রশান্তি।"

সংস্কৃতির শহর কলকাতার ধমনী বেয়ে গতকাল আবারও গড়িয়ে চলল ঐতিহ্যের চাকা। ইসকনের বার্ষিক রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে যদুবাবুর বাজার এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল পরিণত হয়েছিল এক ধর্মীয় মিলনমেলায়। ব্যস্ত শহরের যান্ত্রিকতা, কোলাহল এবং দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি ছাপিয়ে গতকাল ভক্তদের মুখে কেবল একটিই সুর ছিল ‘জগন্নাথ স্বামী নয়ন পথগামী ভবতু মে’। শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার পালনের গণ্ডিতে রথযাত্রাকে সীমাবদ্ধ না রেখে, এটি হয়ে উঠেছিল এক সামগ্রিক সাংস্কৃতিক উৎসব। যদুবাবুর বাজারের মতো জনবহুল এলাকায় বড় কোনো রথ নিয়ে চলাচলের জন্য প্রয়োজন পড়ে কঠোর পরিকল্পনার। আয়োজকদের দাবি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং ভিড় সামলানো ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে স্বেচ্ছাসেবকদের শৃঙ্খলবদ্ধ প্রয়াস এবং পুলিশের সহযোগিতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই রথ তার গন্তব্যে পৌঁছায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন ছিল, যা উৎসবের পরিবেশকে নিরবচ্ছিন্ন রেখেছে।



ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে রথযাত্রা


রথযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। ঐতিহাসিকদের মতে, রথযাত্রার শিকড় প্রোথিত রয়েছে পুরী ধামের জগন্নাথ মন্দিরে। তবে বিংশ শতাব্দীতে ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস’ (ইসকন) বা আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ এই রথযাত্রাকে বিশ্বজনীন রূপ দেয়। ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ চেয়েছিলেন যে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের কাছে কৃষ্ণের প্রেম পৌঁছে দেওয়া হোক। আর সেই লক্ষ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে—লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক, মায়াপুর থেকে কলকাতা—ইসকন মহাসমারোহে রথযাত্রা পালন করে আসছে।


সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য


দিনের শেষে যখন রথটি মন্দিরের দিকে ফিরছিল, তখনো ভক্তদের কণ্ঠে জয়ধ্বনি থামেনি। সূর্যের আলো যখন ম্লান হয়ে আসছে, তখনো যদুবাবুর বাজারের রাস্তায় জ্বলছিল প্রদীপের শিখা। রথযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেল যে, আধুনিকতা যতই আমাদের ঘিরে ধরুক না কেন, শিকড়ের টানে আমরা বারবার ফিরে আসি এই চিরায়ত ঐতিহ্যের কাছে।আগামী বছর আরও বড় পরিসরে এই উৎসবের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে শহরবাসী। কারণ, রথ কেবল একটি কাঠের যান নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির বাহন—যা প্রতি বছর মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে।

You can share this post!