ওয়ারিয়র্স অফ লাইফ’: ক্যানসার জয়ীদের সাহস ও ইমিউনোথেরাপির ক্রমবিকাশ উদযাপন করল মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস’
১ অক্টোবর, ২০২৬, কলকাতা: জীবনের কিছু মুহূর্ত প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিকে অতিক্রম করার প্রেরণা জোগায়—পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া একটি হাসি, প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময়, নতুন একটি সকাল কিংবা পূরণ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা কোনও স্বপ্ন।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা মানুষের কাছে এই সাধারণ মুহূর্তগুলিই হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ তাৎপর্যের।এই সাহস ও লড়াইয়ের কাহিনিকে সম্মান জানাতে মণিপাল কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার কেয়ার সেন্টার, মণিপাল হাসপাতাল, ইএম বাইপাস ইমিউনোথেরাপি নেওয়া ক্যানসার জয়ীদের নিয়ে আয়োজন করল বিশেষ অনুষ্ঠান ‘ওয়ারিয়র্স অফ লাইফ’। তাঁদের যাত্রা, মানসিক দৃঢ়তা, আশাবাদ এবং জীবনের পথে এগিয়ে চলার অদম্য ইচ্ছাকে উদযাপন করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
এই উদ্যোগের মূল বার্তা ছিল—ক্যানসার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে, কিন্তু পরবর্তী জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে এমন নয়। ক্যানসারের যাত্রা শুধু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনিশ্চয়তা, কঠিন সিদ্ধান্ত, আবেগের ওঠানামা এবং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রক্রিয়া। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডাঃ সুদীপ দাস, হেড ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট – মেডিক্যাল অনকোলজি; ডাঃ প্রদীপ কুমার মণ্ডল, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – মেডিক্যাল অনকোলজি; ডাঃ তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিরেক্টর – ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন; ডাঃ দেবদীপ সামাদ্দার, অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট – মেডিক্যাল অনকোলজি এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক (ডাঃ) কল্যাণ ভট্টাচার্য।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘আমরা কি ক্যানসার নিরাময়ের কাছাকাছি? ইমিউনোথেরাপিই কি ভবিষ্যৎ?’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। চিকিৎসক ও রোগীরা একসঙ্গে অংশ নিয়ে ক্যানসার চিকিৎসার পরিবর্তনশীল পরিসর এবং ইমিউনোথেরাপির ভূমিকা নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেন। ক্যানসার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও আলোচনায় উঠে আসে। ইমিউনোথেরাপি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসার কোষকে শনাক্ত ও আক্রমণ করতে সাহায্য করে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ ফলও দেখা গিয়েছে।
অন্যতম বক্তা ডাঃ সুদীপ দাস বলেন, “ইমিউনোথেরাপি ক্যানসার চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে সরাসরি ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে, সেখানে ইমিউনোথেরাপি শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্যানসার কোষ শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। ভারতে এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার ক্যানসার চিকিৎসায় অগ্রগতিরও প্রতিফলন। তবে ইমিউনোথেরাপি সবার জন্য উপযুক্ত নয়; ক্যানসারের ধরন ও পর্যায়, মলিকিউলার ও ইমিউন মার্কার এবং রোগীর সামগ্রিক ক্লিনিক্যাল প্রোফাইলের মতো বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে এর প্রয়োগ নির্ধারণ করা হয়।”
ডাঃ প্রদীপ কুমার মণ্ডল বলেন, “ভারতে ক্যানসার চিকিৎসা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে ইমিউনোথেরাপি। এটি ক্যানসারের চিকিৎসায় একটি ভিন্ন পদ্ধতির প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে শুধুমাত্র টিউমারকে সরাসরি আক্রমণ না করে উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে তাঁদের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগানো হয়। তবে প্রতিটি ক্যানসার আলাদা। তাই ইমিউনোথেরাপি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রোগীর ক্যানসারের ধরন, রোগের বৈশিষ্ট্য এবং প্রাপ্ত চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যক্তিভেদে নির্ধারণ করা জরুরি।”
ডাঃ তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে বলেন, “নির্দিষ্ট ধরনের ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে এবং আমাদের আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে। টিউমারের জীববৈশিষ্ট্য এবং সংশ্লিষ্ট বায়োমার্কার সম্পর্কে ধারণার মাধ্যমে আমরা এমন রোগীদের শনাক্ত করতে পারি,
যাঁরা এই চিকিৎসা থেকে উপকৃত হতে পারেন। ভারতে উন্নত ডায়াগনস্টিক পরিষেবা ও নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত রোগীদের জন্য ইমিউনোথেরাপি আরও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা বিকল্প হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ও সতর্ক পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।”
ইমিউনোথেরাপির অন্যতম প্রধান সুবিধা তুলে ধরে ডাঃ দেবদীপ সামাদ্দার বলেন, “কয়েক দশক ধরে ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল কেমোথেরাপি। তবে সুস্থ কোষের উপর এর প্রভাবের কারণে বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। গত ১০–১৫ বছরে ইমিউনোথেরাপি শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রোফাইল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। দেশে বায়োসিমিলারের উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে এই উন্নত চিকিৎসাগুলি আরও সাশ্রয়ী ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠতে পারে।”
অনুষ্ঠানে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন ক্যানসার জয়ী খড়গপুরের ৬০ বছর বয়সী সৌরভ মতিয়া। তিনি বলেন,“স্টেজ IV ক্যানসার ধরা পড়ার পর আমি সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে চেয়েছিলাম। প্রথমে মুম্বইয়ের একটি শীর্ষস্থানীয় ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার সময় নিয়ে উদ্বেগ ছিল। পরে আমাকে মণিপাল হাসপাতাল ইএম বাইপাস -এ রেফার করা হয়, যেখানে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। ইমিউনোথেরাপি ও কেমোথেরাপির পাশাপাশি নিয়মিত পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমার চিকিৎসা চলে। আজ আমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি—বাজার করতে যাই, মোটরসাইকেল চালাই, এমনকি পরিবারের সঙ্গে পাহাড়েও ঘুরতে যাই। আবার এই সাধারণ জীবনযাপন করতে পারাটা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
৪০ বছর বয়সী গারফিল্ড জুড পেমব্রো, যিনি বর্তমানে ইমিউনোথেরাপি নিচ্ছেন, বলেন,
“চিকিৎসকদের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা এবং চলমান চিকিৎসা অত্যন্ত ইতিবাচক। চিকিৎসা চলাকালীনও আমি দৈনন্দিন জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারছি এবং উল্লেখযোগ্য কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হইনি। আগামী বছরের মার্চে আমার চিকিৎসার সাইকেল সম্পূর্ণ হওয়ার কথা। আমি আশাবাদী এবং জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার দিকে মনোনিবেশ করছি।”
অনুষ্ঠানটি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বাইরেও ক্যানসার-পরবর্তী জীবন, মানসিক সুস্থতা, পরিবারের সহায়তা এবং জীবনের অর্থবহ ছোট ছোট মুহূর্তগুলির গুরুত্বকে সামনে তুলে ধরে। ‘ওয়ারিয়র্স অফ লাইফ’ ছিল ইমিউনোথেরাপি নেওয়া সেই মানুষদের উদযাপন, যাঁরা এখনও বাঁচছেন, স্বপ্ন দেখছেন, সম্পর্ককে উপভোগ করছেন এবং সামনে এগিয়ে চলেছেন—এই বার্তা নিয়ে যে, ক্যানসার জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে, কিন্তু সামনে এখনও অনেক অর্থবহ অধ্যায় অপেক্ষা করে থাকতে পারে।
কারণ ক্যানসারের যাত্রা কঠিন হতে পারে, কিন্তু জীবন এখনও সম্ভাবনায় ভরা।