বিশ্ব ফুটবলের দরবারে ফের একবার উড়ল ভারতের তেরঙা। ব্রাজিলের সাম্বা জাদু ম্লান করে সুইডেনের মাটিতে ফুটবলের ‘বিশ্ব যুব কাপ’ অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী গথিয়া কাপ (Gothia Cup 2026) জয় করল ভারতের মিনের্ভা অ্যাকাডেমি এফসি (Minerva Academy FC)। গত ১৮ জুলাই, ২০২৬-এ অনুর্ধ্ব-১২ (B12) বিভাগের ফাইনালে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ‘আরএস স্পোর্টস ইয়েলো’-কে ২–১ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো মিনের্ভার ছেলেরা।
এই জয়ের ফলে তৈরি হলো এক অভূতপূর্ব ইতিহাস। মিনের্ভা অ্যাকাডেমি এর আগে ২০২৩ (অনুর্ধ্ব-১৩) এবং ২০২৫ (অনুর্ধ্ব-১৪) সালেও বিশ্বসেরা হয়েছিল। ২০২৬-এর এই ট্রফি ডিফেন্ড করার মাধ্যমে মিনের্ভা বিশ্ব ফুটবলে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রমাণ করল। শুধু তাই নয়, ফিনল্যান্ডে 'হেলসিঙ্কি কাপ' জেতার ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই সুইডেনে এই ট্রফি জয় করে এক ঐতিহাসিক ‘ইউরোপিয়ান ডাবল’ সম্পন্ন করল ভারতের এই তরুণ ব্রিগেড।
শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা ও মেখামখ্র-র ম্যাজিক ফ্রি-কিক
শনিবারের মেগা ফাইনালে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে ভারত। ম্যাচের ১১ মিনিটেই কিপগেন থাংসাংলেনের দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে যায় মিনের্ভা। তবে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই গোল শোধ করে সমতা ফেরায় ব্রাজিল (১-১)।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ চরম হাড্ডাহাড্ডি রূপ নেয়। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়াবে, ঠিক তখনই ম্যাচের একেবারে শেষ ২ মিনিটে ম্যাজিক দেখান মিনের্ভার মেখামখ্র নঙরেম। বক্সের বাইরে থেকে এক দূরপাল্লার নিখুঁত ফ্রি-কিকে ব্রাজিলের রক্ষণ প্রাচীর ও গোলকিপারকে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন তিনি। আর এই নাটকীয় গোলের সঙ্গেই ২-১ ব্যবধানে বিশ্বজয় নিশ্চিত করে ভারত।
খেলা শেষে উচ্ছ্বসিত ফরোয়ার্ড থাংসাংলেন কিপগেন বলে, "আমার খেলা সেরা দল এটা। গ্যালারির দর্শকদের দেখুন, তাঁদের সাথে এই জয় উদযাপন করা সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি।"
৯ ম্যাচে ৮৭ গোল! মিনের্ভার বিধ্বংসী পরিসংখ্যান
গোটা টুর্নামেন্টে কার্যত অপ্রতিরোধ্য ছিল মিনের্ভা অ্যাকাডেমি। প্রতিপক্ষ দলগুলোকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়েছে তারা। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তাদের বিশ্বজয়ের অবিশ্বাস্য সফরসূচি:
রাউন্ডপ্রতিপক্ষ (দেশ)ফলাফলহাইলাইটগ্রুপ পর্বপ্রিপ স্কুলস পুমাস ব্লু (ইংল্যান্ড)১২–০ জয়প্রথম ম্যাচেই আধিপত্যের শুরুগ্রুপ পর্বলিলি স্ট্রম এসকে ৩ (নরওয়ে)১৩–১ জয়মাঝমাঠ ও ফরোয়ার্ডের নিখুঁত যুগলবন্দীগ্রুপ পর্বসুর্তে আইএস এফকে (সুইডেন)১৬–০ জয়ক্লিন শিট রেখে বিধ্বংসী মেজাজে ভারতরাউন্ড অফ ৬৪লেগাসি অ্যাকাডেমি (কেনিয়া)৬–২ জয়নকআউটের প্রথম বাধায় সহজ জয়রাউন্ড অফ ৩২প্রিপ স্কুলস লায়ন্স (ইংল্যান্ড)১০–১ জয়ব্রিটিশ ডিফেন্স নিয়ে ছেলেখেলারাউন্ড অফ ১৬ওএফসি কুরোনেস (ফ্রান্স)১৭–১ জয়চলতি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ স্কোরের ম্যাচকোয়ার্টার ফাইনালকাঞ্চেরিটোস এফসি (বলিভিয়া)৮–০ জয়লাতিন আমেরিকার প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করাসেমিফাইনালএফসি লোকোমোটিভ কিভ (ইউক্রেন)৩–২ জয়পিছিয়ে পড়েও লড়াকু প্রত্যাবর্তনফাইনালআরএস স্পোর্টস ইয়েলো (ব্রাজিল)২–১ জয়শেষ মুহূর্তের ফ্রি-কিকে বিশ্বসেরার মুকুট"ইন্ডিয়া কা টাইম আ গয়া!"
গোটা টুর্নামেন্টে ৯ ম্যাচে মোট ৮৭টি গোল করেছে মিনের্ভা, যা এক কথায় অবিশ্বাস্য। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর মিনের্ভা অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা রঞ্জিত বাজাজ অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, "ইন্ডিয়া কা টাইম আ গয়া (ভারতের সময় এবার এসে গেছে)!"
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্র্যাডিশনাল ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ইউরোপের ক্লাবগুলোকে যেভাবে ভারতের ছোট ছোট ছেলেরা মাঠের মধ্যে শাসন করছে, তা ভারতের তৃণমূল স্তরের (Grassroots) ফুটবল বিপ্লবের এক অন্যতম উদাহরণ। সঠিক পরিকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক এক্সপোজার পেলে যে ভারতীয় ফুটবলাররাও বিশ্বমানের হয়ে উঠতে পারে—চণ্ডীগড় ও মোহালি ভিত্তিক এই অ্যাকাডেমি তা বারবার প্রমাণ করে দিচ্ছে।